রাজশাহী থেকে তেল কি রাতারাতি গায়েব হয়ে গেলো?

নিজস্ব প্রতিবেদক

নগরীর কলাবাগান এলাকার বাসিন্দা মোসা. মনি। পেশায় গৃহিনী। সয়াবিন তেল শেষ হওয়ায় বাজারে কিনতে এসেছিলেন তেল। জানতে চাইলে তিনি বলেন, রান্না করতে গিয়ে তেল শেষ হয়েছে আজ। তাই বাড়ির পাশের দোকান গুলোতে তেল নিতে যায়, কিন্তু পায়নি। পরে সাহেব বাজারে আসলে দেখি অধিকাংশ দোকানে তেল নেই। ৫০০ গ্রাম ও ১ লিটারের দু’চারটা তেলের বোতল রয়েছে। তবে নেই ৫, ৩ ও ২ লিটার বোতলের তেল। সব শেষ।

ক্ষোভ প্রকাশ করে এ গৃহিনী বলেন, দিনের পর দিন তেলের দাম বাড়তেই আছে। তার ওপর বাজার থেকে সয়াবিন তেল গায়েব। রাতারাতি এতো তেল গেলো কোথায়?

তিনি বলেন, তেলসহ নিত্যপণ্যের অতিরিক্তি মূল্য বৃদ্ধির দিকে সরকারের নজর দেওয়া উচিৎ। এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ মানুষ সংসার চালাবে কিভাবে আর বাচবে কি করে বলে মন্তব্য করেন এ ক্রেতা।

সাহেব বাজারের সোয়াবিন তেল কিনতে আসা আরেক ক্রেতা মো. আমানুল্লাহ আমান। তিনি বলেন, বাসা থেকে কয়েকদিন যাবৎ তেল কেনার জন্য বলছিলো। আজ বাজারে ৫ লিটারের তেল কিনতে আসি। পুরো বাজার ঘুরে ৫ লিটারের তেল পেলাম না। কয়েকটি দোকানে ৫০০ গ্রাম বা ১ লিটারের তেল থাকলেও নির্ধারিত মূল্যের চাইতে দাম বেশি চায়। তাই তেল না কিনেই বাসায় ফিরতে হচ্ছে।

সরিষা, রাইস ব্র্যান্ডসহ অন্যান্য তেল থাকলেও নেই সয়াবিন তেল। সয়াবিন তেলের জায়গাটি রয়েছে প্রায় ফাকা। ফাইল ফটো।

দুই টাকা পাচ টাকা করে কয়েক দিন যাবৎ বেড়েই চলেছে সয়াবিন তেলের মূল্য। ক্রমান্বয়ে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজশাহীর বাজারে দেখা গেছে তেল সঙ্কট। তবে ভুক্তোভোগী ও খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজারে কৃত্রিম ভাবে সয়াবিন তেলের এ সঙ্কট তৈরি করা হয়েছে। এদিকে হঠাৎ তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রেতাদের মাঝে দেখা গেছে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

বুধবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত নগরীর সাহেব বাজার, শিরোইল কাচাবাজার, লক্ষীপুর ও কোট বাজার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বাজারের অধিকাংশ দোকানেই নেই বোতলজাত তেল। তবে মিলছে খোলা তেল। দোকানগুলোতে ৫০০ গ্রাম, ১ লিটারের কয়েকটি বোতল থাকলেও নেই ৫, ৩ ও ২ লিটারের সোয়াবিন তেলের বোতল।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন খুচরা মুদি দোকানি অগ্নিবাণী নিউজের প্রতিবেদককে জানান, গত দু’সপ্তাহ যাবত ক্রমান্বয়ে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজশাহীর অলিতে-গতিলে এবং বড় বাজারগুলোতে কোথাও ৫ লিটার সোয়াবিন তেলের বোতল নেই। যা ছিল তা অনেক আগেই সবাই কেটে তা খোলা তেল হিসেবে বিক্রি করছে। আবার অনেকেই তেলের অত্যাধিক মূল্য বৃদ্ধি এবং তেলের অসামঞ্জস্যপূর্ণ বাজার ব্যবস্থার কারণে দোকানে সয়াবিন তেল তুলছেন না।

কারণ হিসেবে তারা জানান, বাজারে বোতলজাত তেলের মূল্য ১৬৫ টাকা লিটার। অপরদিকে খোলা তেল বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৬৮ থেকে ১৭৫ টাকায়। এই মূল্য আরও বাড়তে পারে বলেও জানিয়েছেন দোকানিরা। মুদি দোকান, সুপারস্টল ও বাজারের বড় বড় মুদি ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, তেল কোম্পানিকে অর্ডার দিয়েও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তবে খোলা তেলের মজুদ রয়েছে ঠিকই। কিন্তু বোতলজাত তেলের চাইতে দাম তুলনামূলকভাবে লিটারে ৮ থেকে ১০ টাকা বেশি।

নগরীর সাহেব বাজারের বড়সড়ো মুদি দোকান টুটুল স্টোর। সেখানে কথা হয় মোস্তাফিজুর রহমান নামের দোকানের এক কর্মচারীর সাথে। তিনি জানান, প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন যাবৎ তেলের এ সঙ্কট। সাহেব বাজারে বড় তেলের বোতলই নাই। আমাদের এখানে গতকাল ৫ লিটার ও ৩ লিটারের তেল শেষ হয়েছে। ক্রেতারা তেল চাইলে দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। এদিকে কোম্পানিকে বার বার তেলের অর্ডার দেওয়ার পরও তারা তেল দিচ্ছে না দু সপ্তাহ যাবৎ। এতে অনেকটা সমস্যাতেই পড়তে হচ্ছে নিজেদের ও ক্রেতাদের।

তিনি জানান, দু সপ্তাহ ধরে প্রত্যেকটা কোম্পানিকে বলছি তেল দেওয়ার জন্য। কিন্তু তারা দিবো দিবো কওে তেল দিচ্ছে না। বলছে তেল নাই। অনেকে কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ বাজারেই আসছে না। আবার অনেকে ফোন ধরছে না।

এদিকে শিরোইল কাচাবাজার এলাকার চান স্টোরের চান মিঞা জানান, ২০০ গ্রাম ও ৫০০ গ্রামের কয়েকটা তেলের বোতল ছাড়া সোয়াবিন তেল নাই। আমাদের কাছে খোলা তেল আছে। কিন্তু খোলা তেলের দাম বোতলের তেলের চাইতে বেশি। তাই ক্রেতারা তেল কম কিনতে আসছে।

চান মিঞাও জানান, একই কথা। কোম্পানির লোকেদের তেলের অর্ডার করার পরও তারা বলছে তেল নাই। তাই দেওয়া সম্ভব না। আমাদের শিরোইল কাচাবাজারের কোন দোকানেই আর সোয়াবিন তেল নেই। যা ছিল সব শেষ।

তেলের কৃত্রিম সঙ্কট ও ডিলারদের তেল সাপ্লাইয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হাসান আল মারুফ জানান, কিছু অসাধু দুষ্টু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট এধরনের নোংরা কাজগুলো করছে। তারা তেলের কৃত্রিম মজুদ রেখে বাজারে তেলের সঙ্কট তৈরি করছে। তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও তেল মজুদের বিষয়ে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত মঙ্গলবারও এক দোকানকে জরিমানা করা হয়েছে। আজও অভিযান পরিচলনা করছি।

মুদি দোকানিরা ডিলার ও তেল কোম্পানি থেকে পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না এ কারণে বাজারে তেল সঙ্কট তৈরি হয়েছে বলে জানালে তিনি বলেন, ডিলার কিংবা কোম্পানি থেকে বাজারে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে কি না এবিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। এমনটি হয়ে থাকলে আমরা অবশ্যই আমাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবগত করব।

অগ্নিবাণী/এফএ

এই সংবাদটি শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on Whatsapp
Whatsapp
Pin on Pinterest
Pinterest

Leave a Reply

Your email address will not be published.