চাকরী ছাড়লেন ভূয়া সনদে ১০ বছর শিক্ষকতা করা সেই শিক্ষিকা

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
ভূয়া সনদে ১০ বছর ধরে চাকুরীরত সেই শিক্ষিকা অবশেষে সেচ্ছায় চাকরী ছাড়লেন। তিনি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার রিসিকুল ইউনিয়নের সৈয়দপুর শহীদ মঞ্জু উচ্চ বিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী শিক্ষিকা ছিলেন। রাজশাহী আঞ্চলিক শিক্ষা দপ্তরে ভূয়া সনদে চাকুরী অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্বেই তিনি ‘শারিরীক ও পারিবারিক’ সমস্যার কথা জানিয়ে ইস্তফা প্রদান করেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাজশাহী জেলা শিক্ষা অফিসার নাসির উদ্দীন। তিনি জানান, মোবাসসেরা খাতুনের বিরুদ্ধে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন নম্বর ও প্রত্যয়ন জালিয়াতি করে অবৈধভাবে নিয়োগের অভিযোগ আসে শিক্ষা দপ্তরে। যেহেতু মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা রাজশাহী অঞ্চল দপ্তরে ২০০৬ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত কোনো প্রকার রেকর্ড এখানে নেই (ঢাকায় রেকর্ড রয়েছে) সেহেতু প্রকৃত নিয়োগপ্রাপ্ত প্রার্থীর রোল নম্বর আমাদের অনলাইন ডেটাবেজের সার্ভার থেকে যাচাইপূর্বক জালিয়াতির সত্যতা পাওয়া গেছে। বিষয়টি সত্যতার পাওয়ায় উর্ধ্বতনের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তীতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

নিয়োগকালে ওই শিক্ষিকার দাখিলকৃত নথিতেও দেখা গেছে, ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশ নেন। তার রোল নম্বর ২১১৬০৭৭৯। ৪৬ দশমিক ৫০ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি। কিন্তু যাচাইয়ে ধরা পড়ে ওই সনদধারী আদতেই মোবাসসেরা খাতুন নন। সেটি রোজি খাতুনের। সনদ জালিয়াতি করে মোবাসসেরা খাতুন নিয়োগ নিয়েছেন। এমনও অভিযোগ উঠেছে যে, তার এই কাণ্ডে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিরও যোগসাজস রয়েছে। রহস্যজনক কারণে অডিটেও আপত্তি ওঠেনি। তাই ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি ছিলেন ধোরাছোয়ার বাইরে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সাল থেকে কর্মরত তিনি। তার ইনডেক্স নং ১০৮৪৩৩। শুরু থেকেই এমপিওভূক্ত শিক্ষক হিসেবে নিচ্ছিলেন যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু গত ১ আগস্ট তার বিরুদ্ধে এক লিখিত অভিযোগ ওঠে। তদন্ত হয়, সত্যতাও মেলে তদন্তে। তৎপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও আদেশ জারি হয় আঞ্চলিক শিক্ষা দপ্তর থেকে। কিন্তু গত বছরের ০১ ডিসেম্বর তিনি ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক তরিকুল ইসলামের কাছে তার ইস্তফা পত্র প্রদান করেন।

শিক্ষিকা মোবাসসেরা খাতুনের পদত্যাগ পত্র

এবিষয়ে সৈয়দপুর শহীদ মঞ্জু উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলছেন, ‘শারিরীক ও পারিবারিক সমস্যার কারণ দেখিয়ে তিনি চাকুরীর থেকে ইস্তফা দেন। পরবর্তীতে স্কুলের এক জরুরী সভার আহব্বান করা হয়। সেখানে মোবাসসেরার পদত্যাগ পত্রটি নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় সকলের সম্মতিক্রমে সহকারী শিক্ষক (সমাজবিজ্ঞান) পদটি শূণ্য ঘোষণা করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আসলে এসব দেখার সুযোগ আমাদের নেই। এগুলো থানা বা জেলার শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমেই যাচাই-বাছাইপূর্বক একজন শিক্ষকের বেতন-ভাতা নিশ্চিত হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে তাদের কাছেই সর্বপ্রথমে এসব বিষয় ধরা পড়ার কথা। কিন্তু এতোদিন পর এসে এমন অযাচিত বিষয় সত্যিই অনাকাঙ্খিত ও শিক্ষক সমাজের জন্য লজ্জার।’

ইস্তফা প্রদানের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিবেদক মোবাসসেরা খাতুনের মোবাইল নাম্বারে বেশ কয়েকবার ফোন করেও তাকে পায়নি। ফলে তার মন্তব্য মেলেনি।

এ বিষয়ে আঞ্চলিক শিক্ষা দপ্তরের উপ-পরিচালক ড. শরমিন ফেরদৌস চৌধুরী বলছেন, ‘শিক্ষকতার মতন মহান পেশায় কোনো শিক্ষক জালিয়াতির আশ্রয় নেবেন এটি সমাজ-রাষ্ট্র আশা করে না। সেচ্ছায় তিনি চাকরী ছাড়তে পারেন। তবে তার জালিয়াতির বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যা নির্দেশনা প্রদান করবেন সেটিই আমাদের কাছে চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।’

এই সংবাদটি শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Tweet about this on Twitter
Twitter
Pin on Pinterest
Pinterest

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *