নিমালে বাড়ি ক্রয় করেও ১০ বছরেও মেলেনি দখল

নিজস্ব প্রতিবেদক
ছোট একটি মুদি দোকানি ছিলেন মিসকি আলম। বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং কর্পোরেশনের রাজশাহী জোনাল অফিস থেকে টেন্ডারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ২০১০ সালের ৭ জুলাই তিনতলা বিশিষ্ট একটি বাড়ি ক্রয় করেছিলেন মিসকী আলম। কিন্তু বাড়ি ক্রয়ের ১০ বছর অতিবাহিত হলেও অবৈধ দখলদারের হাত থেকে আলমকে বাড়িটি বুঝিয়ে দিতে ব্যর্থ হন কর্তৃপক্ষ। এতে সর্বস্ব দিয়ে বাড়িটি ক্রয় করে দখল পেতে হন্নে হয়ে বিভিন্ন সরকারী দপ্তরে ছুটছেন মিসকি আলম।

ভূক্তভোগীর অভিযোগ, অবৈধ দখলদারের কাছ থেকে বাড়িটি বুঝে নিতে রাজশাহী জেলা প্রশাসনের নিকট সহায়তাও চেয়েছিলো হাউস বিল্ডিং কর্পোরেশন। যার পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবৈধ দখলদার মুক্ত করতে একাধিকবার অফিস আদেশ জারি করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হলেও অজ্ঞাত কারণে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। নিরব নিশ্চুপ ভূমিকায় পালন করছেন প্রশাসন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী নগরীর রাজপাড়া থানাধীন চন্ডিপুর মৌজার আর.এস ২৬ নং খতিয়ানভুক্ত আর.এস ৫০৬ দাগের ০.০৩৮৬ একর জমিতে অবস্থিত তিনতলা বিশিষ্ট বাড়িটি ১০ বছর আগে ২৩ লাখ ৮০ হাজার টাকায় নিলামে হাউস বিল্ডিং কর্পোরেশনের নিকট থেকে ক্রয় করেছিলেন মিসকী আলম। নিয়ম অনুযায়ী এর সমুদয় পাওয়াও হাউস বিল্ডিংকে পরিশোধ করেছেন তিনি।

সূত্র আরও জানায়, বাড়িটির মুল মালিক ছিলেন নগরীর রাজপাড়া থানার চণ্ডিপুর এলাকার মৃত আব্দুস সামাদ। তিনি ঋণ খেলাপী হওয়ায় তার স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানও ঋণ খেলাপীর আওতায় পড়েন। ফলে আদালতের মাধ্যমে রাজশাহী হাউস বিল্ডিং কর্পোরেশন উল্লেখিত বাড়িটির পূর্ণাঙ্গ মালিকানা লাভ করে। পরে ২০১০ সালের ৭ জুলাই হাউস বিল্ডিং কর্পোরেশন সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে বাড়িটি চন্ডিপুর এলাকার মৃত আবুল কাশেমের ছেলে মো. মিসকী আলমের নিকট নিলামে বিক্রি করে দেয়। কিন্তু ঋণখেলাপী হয়ে মালিকানা হারানোর পরও বাড়িটি অবৈধভাবে দখলে রেখে ভাড়া দেন মৃত আব্দুস সামাদের ছেলে সাহজাদা সামাদ সুমন। ঋণ খেলাপীর কারণে হারানো মালিকানা ফিরে পেতে বাবার পরিচয় গোপন করে সাইফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে জমির মালিক বানিয়ে ১৯৭৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারির একটি জ¦াল দলিল (দলিল নং-১০৮৩৮/৭৫) তৈরী করে এবং তার নিজ নামে ২০১০ সালের ৩ আগস্ট তারিখের ১২৯১৯/২০১০ নং দান।

অন্যের নামে পরে বাড়িটির পুনর্দখল পেতে ২০১৪ সালে ৯ মার্চ সাহজাদা সামাদ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনে একটি রিট পিটিশন (পিটিশন নং ৩৯২৯/২০১৪) দাখিল করেন। অবশেষে বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর হাইকোর্ট বেঞ্চে ২০১৮ সালের ১৫ অক্টোবর তা খারিজ হয়ে যায়। পরে দীর্ঘ সূত্রিতার জন্য জ¦াল দলীলের মাধ্যমে সে আবারো নিম্ন আদালতে মামলা করে।

এর আগে ভুক্তভোগী মিসকী আলম ২০১৪ সালের ১২ আগস্ট বাড়িটির দখল চেয়ে হাউস বিল্ডিং কর্পোরেশনের রাজশাহী জোনাল অফিসে লিখিত আবেদন জানায়। পরে ২০১৯ সালের ২০ জানুয়ারি ‘সরকারি ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ভূমি ও ইমারত (দখল পুনরুদ্ধার) অধ্যাদেশ আইন ১৯৭০’ এর ধারা ৫(১), ২ ও ৬ বলে অননুমোদিত অবৈধ দখলদার উচ্ছেদকরণে হাউস বিল্ডিং কর্পোরেশনের রাজশাহীর জোনাল ম্যানেজার মুহাম্মদ আব্দুল বারী রাজশাহী জেলা প্রশাসক বরাবর একটি লিখিত আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন রাজশাহী জেলা প্রশাসক মো. হামিদুল হক গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি বাড়িটির অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে নিলাম ক্রেতা মিসকী আলমকে দখল বুঝিয়ে দিতে ওই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি এক অফিস আদেশে (স্মারক নং- ০৫.৪৩.৮১০০.০১৮.০৯.৩২০.২০.১৭৬) জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুল হুসাইনকে (পরিচিত নং-১৮৫৬৪) নির্দেশ দেন। ওই আদেশে তাকে কার্যক্রম পরিচালনা শেষে প্রতিবেদন দাখিলেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অনিবার্য বা অজ্ঞা কারণ দেখিয়ে নিয়োগকৃত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে কোনো অভিযান পরিচালনা করেননি।

অবশেষে ভুক্তভোগী মিসকী আলম গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর বর্তমান জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল জলিলের নিকট পূর্বের জেলা প্রশাসকের অফিস আদেশটি (অবৈধ দখলদার মুক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা) বাস্তবায়ন করতে লিখিত আর্জি জানান।

তবে ৩৪ লাখ টাকায় মিসকী আলমের নিকট থেকে ভবনটি পুনরায় ক্রয় করে নিয়েছেন বলে অভিযুক্ত অবৈধ দখলদার শাহজাদা সামাদ এই প্রতিবেদকের নিকট দাবি করেন। তবে প্রতিবেদক তার নিকট এই সম্পর্কিত (ভবন ক্রয়ের) তথ্য-প্রমাণাদি চাইলে তিনি তা সরবরাহ করেননি।

ভুক্তভোগী মো. মিসকী আলম বলেন, ‘শাহজাদা সামাদ একজন বড় মাপের প্রতারক। আমি নিজেই হাউস বিল্ডিংয়ের নিকট থেকে বাড়িটি বুঝিয়ে পাইনি। তাহলে তার নিকট আবার ভবনটি বিক্রি করলাম কীভাবে?’

রাজশাহী হাউস বিল্ডিং কর্পোরেশনের প্রধান কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার মজুমদারের নিকট জানতে চাওয়া হলে তিনি আমাদের সময়কে বলেন, ‘ঋণ খেলাপীর মাধ্যমে বাড়িটি হাউস বিল্ডিং কর্পোরেশন মালিকানা লাভ করে। পরে নিয়ম অনুযায়ী- আদালতের মাধ্যমে নিলামে তুলে সর্বোচ্চ দরদাতার নিকট এটি বিক্রিও করা হয়েছে। যেহেতু আমাদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার নেই তাই অবৈধ দখলদার মুক্ত করতে জেলা প্রশাসনের নিকট সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। আমরা নিলাম ক্রেতার নিকট ভবনের মালিকানা বুঝিয়ে দিতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।’

এ ব্যাপারে রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. নজরুল ইসলামের নিকট জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন ভাতাভোগী ও সনদপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। সে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রজন্মের সন্তান হওয়ায় বিষয়টি সেইভাবে হ্যান্ডের করতে বলা হয়েছে। তাই বিষয়টি একটি ‘মিউচুয়্যাল সেটেরম্যান্ট’র মাধ্যমে করা হবে।’

জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল জলিল বলেন, ‘আমি বিষয়টির নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করছি। যত দ্রুত সম্ভব উভয়পক্ষকে নিয়ে বসে এর সুষ্ঠু সমাধান করা হবে।’

এই সংবাদটি শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Tweet about this on Twitter
Twitter
Pin on Pinterest
Pinterest

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *