রাজশাহীতে এক পানের মূল্যই ১০৫০, খেতে লাগে বন্ড সই

নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজশাহীর অঞ্চলে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র ঐতিহাসিক বাঘা মসজিদ। এই বাঘা মসজিদের ভেতরেই কবিরাজ মো. আবু বকর সিদ্দিকের পানের দোকান। পান দোকানটির নাম ‘সিদ্দিক ভাইয়ের নাটোরের বনলতা পান’ স্টোর। সেখানে বিক্রি হয় হরেক রকমের হরেক স্বাদের রসালো ও মনোমুগ্ধকর পান। সিদ্দিক কবিরাজের পান ভান্ডারে এক খিলি পানের সর্বোচ্চ ১০৫০ টাকা ও সর্বনিম্ন ১০ টাকা।

স্থানীয়রা বলছেন, রাজশাহী জেলার দূর-দূরান্ত থেকে ঘুরতে আসা পর্যটকেরা সিদ্দিক কবিরাজের হরেক রকমের দেশী-বিদেশী জর্দ্দা ও মসল্লা দিয়ে তৈরী মনোমুগ্ধকর রসালো পান খেতে ভীড় জমায়। যে একবার খান সে সারাজীবন মনে রাখেন। তবে সকল ক্রেতার নজর কাড়ে বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ও সর্বোচ্চ মূল্যের ‘নবাব পান’। অনেকের প্রশ্ন করেন- এমন কি আছে এই পানে?

৭৩৩ পদের দেশী-বিদেশী জর্দ্দা ও মসল্লার সমারোহ রয়েছে সিদ্দিক পান স্টোরে। এর মধ্যে ৪ ভাগের এক ভাগ দেশী এবং বাকি তিন ভাগই বিদেশী জর্দ্দা-মসল্লা। তিনি পানের ব্যবসা করছেন ৩৩ বছর যাবৎ। অনেক সময় এক খিলি পান খাওয়ার জন্য অনেককেই দু-এক ঘন্টা সিরিয়ালেও দাড়িয়ে থাকতে হয়। কেউ কেউ ধৈর্য্য হারিয়ে স্থান ত্যাগও করেন, কিন্তু ফিরে আসেন পুনরায়।

সিদ্দিক কবিরাজের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হচ্ছে ‘নবাব পান’। এই নবাবী পানের মূল্য ও বন্ড সইয়ের কথা শুনে অনেকেই অবাক হয়ে পড়েন। সকলেই জানতে চান এই পানের রহস্য! মাত্র তিন টি উপাদান দিয়ে তৈরি হয় ‘নবাব পান’। অথচ, এই পানের মূল্য ১০৫০ টাকা।

এক সময় নবাবেরা এই পান খেতো তাই এই পানের নাম ‘নবাব পান’। কুস্তরী, কালোজিরা ও কাঁচা সুপারি দিয়ে বানানো হয় নবাব পান। মূলত এটি যৌন উত্তেজক পান। এই পানটি খেলে শরীরে ৭২ ঘন্টা যৌন উত্তেজনা বিরাজ করে। এতে কোনো পাশর্^-প্রতিক্রিয়া নেই। কিন্তু এই কুস্তরী থাকায় এটি ভবিষ্যতে লিভারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই পান খাওয়ার পূর্বে সেবনকারীকে কিছু বিধি অবশ্যই পালন করতে হবে।

দূর-দূরান্ত থেকে সিদ্দিক কবিরাজের পান খেতে আসেন ক্রেতারা, ক্রেতাদের একাংশের ছবি।

নবাব পান খাওয়ার বিষয়ে সিদ্দিক জানান, ‘নবাব পান’ নিতে হলে একটি সাদা কাগজে বন্ড সই দিতে হবে। সেই কাগজে সেবনকারীর পিতা-মাতার অথবা অভিভাবকের স্বাক্ষরও থাকতে হবে। এছাড়াও সেবনকারী ও অভিভাবকদের ছবি ও ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি জমা দিতে হবে। দিতে হবে অগ্রীম ৫০% পানের মূল্যও। পুলিশ প্রশাসনের মারফতে একদিন পর সেই সেবনকারী বা গ্রাহক পাবেন তার কাঙ্খিত ‘নবাব পান’। তবে পানটি অবশ্যই ভরা পেটে খেতে হবে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, পেটের সমস্যা কিংবা কিডনিজনিত সমস্যা যাদের রয়েছে তাদের এই পান না খাওয়ায় ভালো। কুস্তরী কিডনির ওপর প্রভাব ফেলে। কুস্তরী সম্বলিত নবাব পান খেয়ে ভবিষ্যতে কিডনি সমস্যায় কেউ যেনো দোষ না দিতে পারেন সেই কারনেই এই বন্ড সই। ৩৩ বছরে ‘নবাব পান’ বিক্রি হয়েছে ৪৪টি।

নবাব পান ছাড়াও সিদ্দিকের পানের তালিকায় রয়েছে- জমিদার পান, নাটোরের বনলতা পান, আয়ুর্বেদিক পান, বিয়াই-বিয়ান পান, শালি-দুলাভাই পান, হাসি-খুশি পান, নতুন বাবুর হাতের পান, ভালোবাসার পান, বন্ধু-বান্ধবীর পান, জনতার পান। তবে বিশেষ অনুরোধে স্থানীয়দের তিনি সাধারণ খয়ের জর্দ্দা পানও দিয়ে থাকেন।

জমিদার পানে থাকে ২৩ পদের মসল্লা। এর মূল্য ৫১০ টাকা। জমিদারদের মতন এই পানটির ব্যহিক ভাবে সাজানো হয়। তাই এই পানের নাম ‘জমিদার পান’।

নাটোরের বনলতা পান তৈরি হয় ৩৪টি মসল্লার সমন্বয়ে। নাটোরের বনলতা পানের মূল্য ৪২০ টাকা। এই পানের বাইরে ‘তবক’ দেওয়া থাকে যা বিশেষ একটি মসল্লা। এছাড়াও এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- পানটি মুখে দেওয়ার পর যতই চাবানো হবে ততই বাড়বে। ২০১৭ সালে বাঘা-চারঘাট উপজেলার সাংসদ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহরিয়ার তার জমিদারি পান খান এবং ব্যাপক প্রশংসা করেন। পান খেয়ে অত্যন্ত খুশী হয়ে সিদ্দিক কবিরাজ পান হাজার টাকার বকশিস।

আয়ুর্বেদী পান মূলত নেশা জাতীয় পান। এই পানে ২২টি দেশী-বিদেশী জর্দ্দা দেওয়া থাকে। আয়ুর্বেদী পানের মূল্য ২৫০ টাকা। এটি বিভিন্ন মেলা ও ওরশ মাহফিলে বেশী বিক্রয় হয়। তবে ইদানীং উঠতি বয়সের তরুণেরা এই পান বেশী পচ্ছন্দ করছে বলেও জানান পানওয়ালা সিদ্দিক।

এছাড়াও রয়েছে বিয়াই-বিয়ান পান ২১০ টাকা, শালি-দুলাভাই পান ১৭০ টাকা, হাসি-খুশি পান ১১০ টাকা, নতুন বধুর হাতের পান ৯৫ টাকা, ভালোবাসার পান ৪৫ টাকা, বন্ধু-বান্ধবীর পান ২৫ টাকা ও জনতার পান ১০ টাকা। এর মাঝে হাসি-খুশি পানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- এতে হাল্কা বা অল্প মাত্রায় লাফিং গ্যাস জাতীয় পদার্থ ব্যবহার করা হয়। যার কারণে পান সেবনকারী এই হাসি-খুশি পান খাওয়ার পর বিনা কারনেই হাসতে থাকেন। এছাড়াও প্রত্যেকটি পানের নামকরণে রয়েছে পানওয়ালা সিদ্দিকের যৌক্তিক ব্যাখ্যা।

কবিরাজ আবু বকর সিদ্দিক (৫৩) নাটোরের লালপুর উপজেলার জয়রামপুর-বেড়িলাবাড়ি গ্রামের মৃত গরিবউল্লার সন্তান। সাত ভাই-বোনের মধ্যে সিদ্দিক বড়। পরিবারে অভাবের তাড়নায় ১৯৮২ সালে তিনি কলকাতায় পাড়ি জমান কাজের সন্ধানে। সেখানে গিয়ে কাজের ফাকে তার নজর কাড়ে কলকাতার রসালো স্বুস্বাদু পান। ১৯৮৭ সালে কলকাতা থেকে দেশে ফেরেন। অভাব-অনটন ও স্বল্প পুঁজি থাকায় তিনি শুরু করেন পানের ব্যবসা। দীর্ঘ ৩৩ বছর পানের ব্যবসা করে বেশ সাবলম্বীভাবেই সংসারের হাল ধরেছেন তিনি। শুরুতে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে পান বিক্রি করতেন। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী বাঘা মসজিদেই বসছেন তিনি।

তবে বিভিন্ন মেলা বা উৎসবেও তিনি যান। কিন্তু মেলায় বখাটে ও চাঁদাবাজদের বিপত্তি এড়াতে মেলার কমিটি সভাপতি ও সদস্যদের দায়িত্ব নিতে হয় সিদ্দিকের, অন্যথায় সেই মেলায় তিনি যান না বলে জানিয়েছেন সিদ্দিক।

সিদ্দিকের পানের ব্যবসার রয়েছে লাইসেন্স। তার দোকানের লাইসেন্স নম্বর ১৮৬৭। পাঁচ বছর পরপর সেই লাইসেন্স রিনিউ করতে হয়। তার দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা আছে- ‘আপনজনের জন্য নিয়ে যাবেন, ভালো লাগলে দাম দেবেন, না লাগলে দেবেন না’।

পানের বিক্রয় সম্পর্কে কবিরাজ সিদ্দিক বলছেন, বিভিন্ন পণ্যের দামসহ যাবতীয় খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকা আয় হতো। করোনায় আসার পর থেকে তার ব্যবসায় নেমেছে ধস। যেখানে এক মাসে প্রায় লাখ টাকার পান বিক্রয় করেছেন সেখানে করোনায় তিনি তুলতে পারেননি বাড়ির পেট চালানোর মতন খরচ।

সিদ্দিক শুধু প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত পানওয়ালা কবিরাজই নন। দর্জির কাজও জানেন তিনি। করোনাকালে পরিবারে বৃদ্ধ মাসহ ৫ সদস্যের পরিবার নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন জীবন যুদ্ধ। সন্ধার পর স্থানীয় এক টেইলার্সে কাজ করেন তিনি।

বই মেলা, বাণিজ্য মেলা, সাধু-সংঘ মেলা, হরিবসন, লীলা-কীর্তন, জলসা, ওরস মাহফিল ও ঐতিহাসিক মেলা চলাকালীন সময়ে সারাদিনই খোলা থাকে তার দোকান। এসময় জনসমাগম বেশী থাকায় কয়েকদিনের ব্যবধানে লাখ টাকার পানের বিক্রয় হয় বলে জানান কবিরাজ সিদ্দিক।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Tweet about this on Twitter
Twitter
Pin on Pinterest
Pinterest

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *