হাড় কাপানো শীতে ২৪টি বেদে পরিবারের পাশে ‘মানবিক পুলিশ’ ইমন

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

রাজশাহীর তানোর থানার অদূরে শিবনদীর পাশে বিলকুমারী বিলের খোলা আকাশের নিচে বেশ কিছুদিন যাবৎ খুপরিঘরে দিনাতিপাত করছেন ২৪টি বেদে পরিবার। উত্তরাঞ্চলের হাড় কাঁপানো কনকনে শীতের তীব্রতায় ২২টি শিশু সন্তান নিয়ে এই ২৪টি বেদে পরিবারের অবস্থা যেন নিদারুণ কষ্টের। একদিকে আর্থিক অস্বচ্ছলতা অন্যদিকে হাড় কাপানো শীতের তীব্রতা। বলা যায়, দুঃখ-কষ্ট যেনো তাদের নিত্য সঙ্গী। কোনো এক ডিউটির রাতে বেদে পরিবারগুলোর এমন হৃদয় বিদারক জীবন-যাপনের দৃশ্য মনে দাগ টানে তানোর থানার এএসআই মো. ফারুক হোসেন ইমনের। দু’দিন পরই বেশকিছু বন্ধুদের সহযোগিতায় শীত নিবারণের জন্য কম্বল নিয়ে হাজির হন তাদের মাঝে।

গতকাল বুধবার (২৩ ডিসেম্বর) বিকালে মাসুদ বকশীর পাঠানো এই ২৬টি কম্বল অসহায় বেদে পরিবারগুলোর মাঝে বিতরণ করা হয়।

মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা মো. ফারুক হোসেন ইমন বলেন, ‘ডিউটিরত অবস্থায় কনকনে এই শীতের রাতে শিবনদীর পাশের রাস্তা দিয়ে যখনই যায় তখন বেদে পল্লীর অসহায় এই ৭০টি মানুষের  শীতের আর্তনাদ আমার বিবেককে তাড়িত করে। আমি উপলবিদ্ধ করি, রাতে ডিউটিরত অবস্থায় যখন গাড়ির জানালার কাঁচ খুলে দেই তখন শীতের এই তীব্রতায় শরীরটা মনে হয় একেবারে জমে যায়। কিন্তু অসহায় এই পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে শীতের মধ্যে যে কষ্টে দিনাতিপাত করছে সেজন্য অনেক কষ্ট লেগেছে। তাদের জন্য অন্ততপক্ষে শীতের এই কষ্ট দূরিভূত করতেই আমার ও আমার বন্ধুদের ক্ষুদ্র এই প্রয়াস।’

হাড় কাপানো শীতে ২৪টি বেদে পরিবারের পাশে ‘মানবিক পুলিশ’ ইমন

তিনি আরও জানান, ‘সত্যি কথা বলতে বেদে পরিবারের এই কষ্টের জীবনের কথা শেয়ার করি আমার বন্ধুদের মাঝে ‘SSC 02 & HSC 04’ (বাংলাদেশর সকল ২০০২ সালের এসএসসি ও ২০০৪ সালে এইচএসসি পাশ করা বন্ধুদের গ্রুপ) এবং ‘দূরন্ত রাজশাহী’ নামে (রাজশাহীতে এসএসসি’০২ ও এইচএসসি’০৪ ব্যাচের ফেসবুক গ্রুপ) একটি ফেসবুক গ্রুপে। এই পোস্টটি দেখে অসহায় বেদে পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ান মাসুদ বকশী নামে ওই ব্যাচেরই ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিসিসি) এক কর্মকর্তা। অসহায় এসব পরিবারকে শীতের তীব্রতা থেকে রক্ষা করতে তাদের জন্য পাঠিয়ে দেন কম্বল কেনার অর্থ। আরও এক বন্ধু পাঠান শীতবস্ত্র এছাড়াও ‘দূরন্ত রাজশাহী’র বন্ধুরাও পাশে দাড়ান তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে। সব মিলিয়ে ‘দূরন্ত রাজশাহী’র ও দেশের সকল ০২-০৪ বন্ধুদের সমন্বয়ে আগামী দু’এক সপ্তাহের দিকে আবারও ওই বেদে পরিবারের সকল ছোট-বড় সদস্যদের জন্য শীতের গরম কাপড়ের বন্দোবস্ত করতে পারবো বলে আশা করছি।’

শীত নিবারণের জন্য কম্বল পেয়ে বেদে সর্দার মো. কালা চাঁদ সরদার বলেন, ‘আমরা ছিন্নমূল মানুষ, বেদে পরিবার। কনকনে এই শীত আর হাড় কাঁপানো ঠা-া বাতাসে আমাদেরকে এই খুপড়ি ঘরেই থাকতে হয়। কিন্তু কেউ আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে না। বর্তমানে করোনার কারণে আমাদের যে পেশা, তাকে আয় রোজগার একেবারেই নেই। রাতে অনেক কষ্ট করে এই খুপড়ি ঘরে ছোট ছোট সন্তান নিয়ে বাস করি। সকাল হলেই যে যার কাজে গ্রামে বেরিয়ে পড়ি। করোনাকালে সরকার আমাদের এই অসহায় সন্তানগুলোর দিকে একটু নজর দিলে আমরা উপকৃত হতাম।’

হাড় কাপানো শীতে ২৪টি বেদে পরিবারের পাশে ‘মানবিক পুলিশ’ ইমন

শীতবস্ত্র বিতরণকালে তানোর থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি মো. রাকিবুল হাসান বলেন, ‘ইমন অত্যন্ত ভালো একটি পুলিশ অফিসার। মানবিক কাজের জন্য সে এই এলাকায় সকলের কাছেই বেশ প্রিয়। তার এমন মহৎ কর্ম সত্যিই প্রশংসনীয়।’

বেদে পরিবারের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, ‘আপনাদের জন্য সরকার ও পুলিশ প্রশাসন সব সময় পাশে আছে। সাহায্য লাগলে আমরা দেব, কিন্তু আপনারা কেউ অপরাধ কর্মের সাথে জড়াবেন না। সমস্যা হলে জানাবেন সাধ্যমতন চেষ্টা করা হবে আপনাদের পাশে দাড়ানোর।’

ফেসবুক গ্রুপ ‘SSC 02 & HSC 04’  ও ‘দূরন্ত রাজশাহীর’ সহযোগিতায় কম্বল বিতরণের এই অনুষ্ঠানে তানোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান, এএসআই মো. ফারুক হোসেন ইমন, দৈনিক আমাদের সময়ের ব্যুরো প্রধান আমজাদ হোসেন শিমুল, দৈনিক অগ্নিবাণী পত্রিকার সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ, রাবি কর্মকর্তা নুর কুতুবুল আলম জুয়েল, তানোর প্রেসক্লাব সভাপতি সাইদ সাজু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা এএসআই ফারুক হোসেন ইমন ব্যক্তিগত উদ্যোগে তানোর উপজেলায় শ্রেষ্ঠ গ্রাম পুলিশ পদক প্রবর্তন করেন। সাধ্যমত সবসময় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই যেন শান্তি খুঁজে পান তিনি। শুধু তিনি নন, রাজশাহীতে তার এসএসসি’০২ ও এইচএসসি’০৪ ব্যাচের ফেসবুক গ্রুপ ‘দূরন্ত রাজশাহীর’ সদস্যরা এভাবেই বিভিন্ন সময় অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Tweet about this on Twitter
Twitter
Pin on Pinterest
Pinterest

Leave a Reply

Your email address will not be published.