রাজশাহীতে হত্যা মামলার আসামীকে বাঁচাতে ডাক্তারের ভুয়া সনদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

রাজশাহী নগরীর শাহমখদুম থানার ভুগরইল পশ্চিমপাড়া এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রতিবেশী এক যুবককে মাথায় রামদার কোপ ও শাবল ঢুকিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার অভিযোগে রাজশাহী সরকারি পিএন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের এমএলএসএস (মালি) সুজন আল হাসানকে গ্রেফতার করে নগরীর শাহমুখদুম থানা পুলিশ। হত্যা মামলায় এজাহারভূক্ত ৩নং আসামী জানা সত্তে¡ও সুজনকে মিথ্যে প্রত্যয়ন প্রদান করেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক। ওই প্রত্যয়নের সত্যতা প্রমাণে আরও একটি ভুয়া মেডিকেল প্রত্যয়নের বন্দবস্ত করেন তিনি, এতে সাংবাদিকদের হাতে ধরা খান প্রত্যয়ন প্রদানকারী রাজশাহী মডেল হাসপাতালের ডাক্তার।

সুজনের মিথ্যে মেডিকেল সার্টিফিকেট এবং ছুটির দরখাস্ত দেখতে চাইলে সাংবাদিকদের তা দেখাননি প্রধান শিক্ষিকা তৌহিদ আরা। আবার সুজনকে কবে ও কোন তারিখে এবং কি কারণে ভর্তি হয়েছেন তা বলতেও ব্যর্থ হন তিনি। সুজনের একটি ভিডিও সাক্ষাৎকার নিলে সেখানে তিনি কোন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন? কোন ডাক্তারকে দেখিয়েছিলেন? সেটাও বলতে গিয়ে কথা আটকে যায় হত্যা মামলার আসামী সুজনের। কিন্তু হঠাৎ অলৌকিকভাবে চলতি মাসের ৫ তারিখে অফিসের কারণ দর্শানো নোটিশ, মেডিকেল সার্টিফিকেটসহ কারণ দর্শানো নোটিশের ব্যাখ্যা দেন মালি সুজন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিএন স্কুলের অন্যান্য কর্মচারীদের সাথে সুজনের অস্বুস্থতার বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘দীর্ঘদিন সুজনের সাথে আমরা কাজ করেছি, কিন্তু সুজনের মেরুদন্ড ও মাজা ব্যাথার সমস্যা আছে এটা শুনি নাই। জেল থেকে বের হয়ে আসার পর থেকে শুনছি তার মেরুদন্ড ও মাজা ব্যাথার সমস্যা আছে।’

হত্যা মামলায় জড়িত পিএন স্কুলের মালি সুজনকে প্রত্যয়ন ও চিকিৎসা প্রদানের বিষয়টি স্বীকার করেন রাজশাহী মডেল হাসপাতালের ডা: এবিএম কামরুল আই সরকার (কনসালটিং ফিজিশিয়ান)।

চিকিৎসকের ভাষ্য, ‘কার শারিরীক সমস্যা আছে, আর কার নেই তা পরীক্ষা ছাড়া বোঝা সম্ভব নয়। আবার, কে অপরাধী বা নিরপরাধ সেটা দেখার সময়ও আমার নেই। তবে পিএন স্কুলের মালি সুজন আল হাসান আমার কাছে ১২/১০/২০১৯ তারিখে মেরুদন্ড ও মাজা ব্যাথাজনিত কারণে হাসপাতালে আসেন চিকিৎসার জন্য। তাকে প্রয়োজনীয় টেস্ট করিয়ে রিপোর্ট অনুযায়ী ঔষধ দেই। সেই সাথে তাকে দুই মাসের বেড রেস্ট সাজেস্ট করি।’

এদিকে সুজনের কারাভোগকালীন সময়ে তাকে প্রত্যয়ন দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলছেন, ‘সুজন জেলে থাকাকালীন সময়ে তার স্ত্রী আমার কাছে আসে। তিনি জানান তার স্বামীর শারিরীক অবস্থা আবারও খারাপ হয়ে পড়েছে। আমি তাকে একটি চিকিৎসা ফরম দেই। সেটা পুরণ করে তিনি আমাকে দিলে সেই অনুযায়ী আমি সুজনকে প্রয়োজনীয় ঔষধ প্রেসক্রাইব করি এবং আবারও দুই মাস রেস্ট নেওয়ার পরামর্শ দেই।’

সুজন তার রোগী ছিল তা প্রথার্ধে ডাক্তার কামরুল স্বতস্ফূর্তভাবে স্বীকার করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে হত্যা মামলার আসামী সুজনকে কারাগারে থাকার পরও মেডিকেল সার্টিফিকেট কিভাবে দিলেন তা জানতে চাইলে তিনি বলেন- ‘সুজন আমাকে বিষয়টি জানায়নি। তার জন্য আজ আমাকে ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে আমি প্রয়োজনে মামলা করব।’

অথচ তিনি বলছেন, সুজনের স্ত্রী সুজনের জেলে থাকাকালীন শারিরীক অবনতির কথা জানালে তিনি ঔষধ লিখে দেন এবং সেই সাথে দুই মাসের বেড রেস্ট করার সার্টিফিকেটও দেন বলে স্বীকার করেন।

কারাগারে থাকাকালী কোনো হাজতি বা কয়েদি সরকারি হাসপাতা ছাড়া বাইরের চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারেন না। সেক্ষেত্রে কিভাবে আপনি সুজনকে প্রেসক্রাইব করলেন ও সার্টিফিকেট দিলেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সুজনের স্ত্রী হয়ত কোনো মেকানিজম করে বা ভুয়া কাগজ বানিয়ে এনেছিল। আর তাতে আমি যাচাই না করে ভুল বশত কাজটি করে ফেলেছি।’

গোপন সূত্রে জানা যায়, ডাক্তার কামরুলের মেয়ে রাজশাহী গভ: পিএন গালর্স হাইস্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়েন। প্রধান শিক্ষিকা ও মালি সুজন দ্বারা প্রভাবিত হয়েই তিনি ভুয়া সনদ প্রদান করেন।

মালি সুজন জেলে থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বর ডাক্তারের প্রদানকৃত ভুয়া প্রেসক্রিপনের ছবি।

এদিকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার মো. গিয়াস উদ্দীন জানান ভিন্ন কথা।

তিনি বলেন, ‘কারাগারের নিয়ম অনুসারে কোনো আসামী অস্বুস্থ হলে প্রাথমিকভাবে জেলের মধ্যে অবস্থিত হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। শারিরীক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হলে তাকে জেল চিকিৎসকের রেফারেন্সে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) প্রেরণ করা হয়। যদি রামেকেও তার চিকিৎসা না হয়, সেক্ষেত্রে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে পাঠানো হয়ে থাকে। কিন্তু কোনো ভাবেই একজন আসামীকে (হাজতি) প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

তিনি আরও জানান, ‘১৭ নাম্বার মামলার ৩নং এজহারভূক্ত আসামী সুজনের জেল রেকর্ড চেক করে দেখা হয়েছে। তার কারাগারে আগমন হয় ২০ অক্টোবর ২০১৯ এবং কারামুক্তি পান ১৫ জানুয়ারি ২০২০ সালে। এসময়ের মধ্যে তিনি জেল হাসপাতালে কখনই ছিলেন না। জেলে সাক্ষাতে আসা ব্যক্তিদের এক টুকরো কাগজ এপার ওপার করার ক্ষমতা নেই, সেখানে বাইরের মেডিকেল ফরম, অফিসিয়াল নোটিশ, ছুটির দরখাস্ত বা কোনো কাগজপত্র সই করে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। যে কোনো প্রকারের কাগজাদি সংক্রান্ত কাজ থাকলে উকিলের মারফত প্রেরণ করতে হবে, অন্যথায় সম্ভব নয়।’

ভুয়া মেডিকেল সনদ ও প্রেসক্রিপশনের বিষয়ে জানতে চাইলে মালি সুজন বলেন, ‘যার কাছে থেকে সার্টিফিকেট নিয়েছি ও চিকিৎসা করিয়েছে তাকেই জিজ্ঞাসা করেন পেয়ে যাবেন। আমার কথা বলতে ভালো লাগছে না। আমি আপনার সাথে কথা বলব না। কবে চিকিৎসা করেছি তারিখ মনে নাই। দেখা করেন, কাগজপত্র দেখে জানাবো।’

হত্যা মামলার আসামী হয়েও চাকরীতে পুনঃবহাল, মিথ্যে প্রত্যয়ন এবং ভুয়া ডাক্তারি সার্টিফিকেট প্রদানের বিষয়ে জানতে চাইলে পিএন স্কুলের প্রধান শিক্ষক তৌহিদ আরা জানান, ‘এমএলএসএস সুজন তার মামলা ও জেলে খাটার বিষয়টি আমার কাছে গোপন করেই প্রত্যয়ন নিয়েছে যা আমি অবগত ছিলাম না। তাকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং সে তার ব্যাখ্যা প্রদানসহ কিছু মেডিকেল সার্টিফিকেটসহ কাগজাদি জমা দিয়েছে। সমস্ত কাগজ ঢাকায় পাঠানো হয়েছে, সে অপরাধী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার মেডিকেল সনদ ভুয়া কিনা তা আমি বলতে পারব না।’

এই সংবাদটি শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Tweet about this on Twitter
Twitter
Pin on Pinterest
Pinterest

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *