চীন থেকে ফেরা বাংলাদেশীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হবে

অগ্নিবাণী ডেস্ক

ভীতি ছড়ানো বিধ্বংসী করনোভাইরাস যদি এমন একটি দেশে প্রবেশ করে যাদের এমন প্রাদুর্ভাব মোকাবেলার সক্ষমতা নেই, তখন কী হবে?

এমন প্রশ্ন এখন বিশে^র সব দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ সংশ্লিষ্টদের। অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে এই ভাইরাসের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে শনাক্ত করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তির দেখভাল করার সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। আশঙ্কা হলো সে সব দেশে এই ভাইরাস অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং কিছু সময়ের জন্য বিষয়টি নজরে নাও পড়তে পারে। ২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় যা ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব সেখান থেকে বোঝা যায় যে এইরকম প্রাদুর্ভাব দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলোর ওপর কত ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে।

করোনাভাইরাস যদি এমন কোনো দেশকে পীড়িত করে তবে এটি নিয়ন্ত্রণ করা অবিশ্বাস্য রকমভাবে কঠিন হয়ে পড়বে।

তাই করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব চীনের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ায়, বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও)। চীনে এই ভাইরাসে এখন পর্যন্ত ১০ হাজার জনের আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এতে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২১৩ জনের। ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, অন্যান্য ১৮টি দেশে আরও ৯৮ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে।

তবে চীনের বাইরে এখনও কারও মৃত্যু হয়নি। চীনের বাইরের দেশের যত মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের বেশিরভাগ চীনের উহার শহরে ছিলেন।

বাংলাদেশেও করোনাভাইরাস নিয়ে তীব্র উদ্বেগ উৎকণ্ঠা রয়েছে। চীনের হুবেই শহর থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে ৩৬১ জন বাংলাদেশিকে। আজ শনিবার ভোরে বাংলাদেশে পৌঁছাবেন তারা। এর পরবর্তী ১৪ দিন নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য তাদের রাখা হবে আশাকোনার হজ ক্যাম্পে স্থাপিত ‘আইসোলেশন ইউনিটে’। এরই মধ্যে ‘আইসোলেশন ইউনিটে’ প্রায় সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছে।

রাজধানীসহ দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে করোনাভাইরাস আক্রান্ত সন্দেহে একজন চীনা নাগরিকসহ মোট তিনজন রোগী ভর্তি হন। তাদের মধ্যে খুলনা হাসপাতালে ১ জন, রাজধানীর গুলশানের বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালে ১ জন ও সর্বশেষ কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন ১ জন। হাসপাতালে ভর্তি তিনজন রোগীর মধ্যে দুজনের ইতোমধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় করোনাভাইরাস ধরা না পড়ায় চিকিৎসকের পরামর্শে বাড়ি ফিরে গেছেন।

দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, হাজি ক্যাম্পের ৩ তলার ৪টি ডরমেটরিতে ৩৬১ জনকে রাখা হবে। প্রতিটি ডরমেটরিতে ১০০ জনের থাকার ব্যবস্থা করা হবে। সেখানে বিছানা, চাদর, বালিশ, মশারি, মেডিসিন, পানি, লাইট, টয়লেট থাকবে। সকাল ও বিকালের নাস্তাসহ ৫ বেলা খাবারের ব্যবস্থা থাকবে। শিশু ও নারীদের জন্যও থাকবে আলাদা খাবার ও থাকার ব্যবস্থা।
তারা যেন বাইরে বের না হোন সে জন্য তৃতীয় তলার সিঁড়ির প্রবেশ পথে কলাপসিবল গেট লাগিয়ে দেওয়া হবে। যাতে ১৪ দিনের মধ্যে কেউ বাইরে যেতে না পারেন। আর যারা সেবা দেবেন তাদেরকেও বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিয়ে তারা ৩৬১ জনকে সেবা দেবেন। এ ছাড়া হজ ক্যাম্পে একটি অফিস থাকবে যার মাধ্যমে সবকিছু পরিচালিত হবে। পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে নিরাপত্তার জন্য পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি থাকবে। এ ছাড়া ইমিগ্রেশনসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরাও দায়িত্ব পালন করবেন। আর হজ ক্যাম্পে থাকা অবস্থায় কেউ অসুস্থ হলে তাদের কুর্মিটোলা হাসপাতাল, সিএমএইচ বা কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নেওয়া হবে। সেখানে যথাযথ চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চীন থেকে ৩৬১ জনকে আনতে বিশেষ বিমানটি ছেড়ে গেছে বিকাল ৫টায়। বিমানটিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সেনাবাহিনীর ৪ থেকে ৫ জন ডাক্তার আছেন। বিমানে থাকবে মাস্ক, গাউন, মেডিসিনসহ যাবতীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা। ঢাকায় আসার পর তাদেরকে বিশেষ ব্যবস্থায় বিমানবন্দর থেকে হজ ক্যাম্পে রাখা হবে। সে জন্য একটি কোর টিমও তৈরি করা হয়েছে। যার মাধ্যমে কাজটি করা হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের জানান, এখন পর্যন্ত একজন চীনা নাগরিকসহ চীন ফেরত মোট তিনজন রোগী জ্বর ও ঠান্ডায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তাদের মধ্যে রাজধানীতে দুজন ও খুলনা হাসপাতালে ১ জন ভর্তি হন। ইতোমধ্যে তিনজন রোগীর দুজন বাড়ি ফিরে গেছেন। তাদের নমুনা পরীক্ষায় নোভেল করোনাভাইরাসের উপস্থিতি মেলেনি।

করোনাভাইরাসের সতর্কতা হিসেবে আগাম প্রস্তুতি ও আক্রান্ত রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে সারা দেশের সরকারি হাসপাতালে অনতিবিলম্বে আইসোলেশন ইউনিট খোলার নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এ নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে হাই ডিপেন্সি ইউনিট (এইচডিইউ) সাপোর্টযুক্ত আইসোলেশন ইউনিট খোলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন বলেন, আমরা আগে থেকেই এই ভাইরাসের বিষয়ে অবগত। করোনাভাইরাস মোকাবেলার আগাম প্রস্তুতি এরই মধ্যে আমরা নিয়েছি। আমাদের আইসোলেশন ইউনিটে সিনিয়র-জুনিয়র চিকিৎসকরা থাকবেন।

উল্লেখ্য, এইচ-ওয়ান-এন-ওয়ান ভাইরাসটি ২০০৯ সালে বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, এতে প্রায় ২ লক্ষাধিক মানুষ মারা যায়। ২০১২ সালে পোলিও প্রায় নির্মূলের পর্যায়ে চলে গেলেও ২০১৩ সালে পোলিওর সংখ্যা আবার বেড়ে যায়। আমেরিকা অঞ্চলে জিকা রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পরে ডব্লিউএইচও ২০১৬ সালে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। পশ্চিম আফ্রিকাতে প্রায় ৩০ হাজার লোক সংক্রামিত হওয়ায় এবং ১১,০০০ মানুষ এই ইবোলায় প্রাণ হারানোর কারণে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে প্রথম জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয় ২০১৪ সালে আগস্টে। যা ২০১৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। ডিআর কঙ্গোতে এই প্রাদুর্ভাব পুনরায় ছড়িয়ে পড়ায় গত বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।

জেনেভাতে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান ড. টেড্রোস ভাইরাসটিকে একটি অভ‚তপূর্ব প্রাদুর্ভাব হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি চীনা কর্তৃপক্ষের অসাধারণ পদক্ষেপ গ্রহণের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, চীনে বাণিজ্য বা ভ্রমণ সীমাবদ্ধ করার কোনো কারণ নেই। একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলি, এই ঘোষণাটি চীনের প্রতি অবিশ্বাস বা অনাস্থার জন্য নয়।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Tweet about this on Twitter
Twitter
Pin on Pinterest
Pinterest

Leave a Reply

Your email address will not be published.