হার না মানা এক তরুণের গল্প!

অগ্নিবাণী ডেস্ক

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী বাহার উদ্দীন রায়হান, পাড়ার বাকি দশটি ছেলের থেকে একদম ভিন্ন। তার বেড়ে ওঠা কক্সবাজার জেলার জহিরপাড়ায়। সদা চঞ্চল আট বছর বয়সী এ শিশুর খেলাধুলায় পাড়া মাতিয়ে রাখায় ছিল কীর্তি। ২০০৪ সালের ৩০ অক্টোবর। বিকেল গড়িয়ে আকাশে সবে সন্ধ্যা নামল।

খেলাধুলায় মশগুল রায়হানের দৃষ্টি পড়ল পল্লী বিদ্যুতের খুঁটির ট্রান্সফরমার মেশিনে। সেখানে আটকে ছিল একটি ছোট্ট পাখি। পাখিটিকে উদ্ধার করতে বৈদ্যুতিক খুঁটি বেয়ে ওপরে উঠলেন রায়হান। কিন্তু পাখিটিকে ছুঁতেই বীভৎস এক শব্দে থমকে গেল পুরো পাড়া। ছিটকে পড়ে যান নিচে, ঝলসে যায় রায়হানের দুই হাত, বুকের কিছু অংশ, ও পায়ের তালু। তৎক্ষণাৎ প্রতিবেশীরা তাকে নিয়ে যান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয় তাকে। এক সপ্তাহ পর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায় রায়হানের পুরো এক হাত ও আরেক হাতের কনুই পর্যন্ত ফেলা দেওয়া হয়।

দীর্ঘ ১৬ দিন পর জ্ঞান ফেরে তার। রায়হান চোখ মেলে দেখে পুরো শরীর তার ব্যান্ডেজে মোড়ানো। এত বড় দুর্ঘটনার ধকল, এরপর দেহের অঙ্গ বিচ্ছিন্ন অবস্থা দেখে অনেকটা স্তব্ধ ৮ বছর বয়সী এই শিশু। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা পরিবারকে আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের মাদ্রাজে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে মাদ্রাজে গিয়ে চিকিৎসা করানো তাদের কাছে দুঃসাধ্য ছিল। পরিবারের দারিদ্র্যের কাছে হেরে যায় সুস্থ হওয়ার স্বপ্ন। এরপর ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকে। এক পর্যায়ে হাসপাতালের পরিপূর্ণ চিকিৎসা সম্পূর্ণ করে সুস্থ-সবল রায়হানকে বাড়িতে নেওয়া হয়।

জীবনযুদ্ধে রায়হান: দীর্ঘদিনের চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরা রায়হানের প্রতিটি দিনই যেন পানসে যাচ্ছিল। পাড়ার অন্য ছেলেদের মতো স্কুল পোশাক পরিধান করে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে গিয়ে পড়ালেখার করার ইচ্ছাটা ক্রমে বেড়েই যাচ্ছিল তার। দুর্ঘটনায় হাত হারানো এ ছেলেটিকে রাখতে চায়নি স্কুল কর্তৃপক্ষ। রায়হান বলেন, ‘ছোটবেলায় যে স্কুলে পড়তাম সেখানে মেধা তালিকায় ভালো স্থানে ছিলাম। তবুও আমার হাত নেই তাই স্কুলের কেউই আর রাখতে চাননি আমাকে। ছোটবেলায় আমাদের এলাকার এক নামকরা স্কুলে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন ছিল। একদিন আমার মামাকে নিয়ে যাই সেখানে। তারাও আমার শারীরিক এই অবস্থা দেখে ভর্তি করেনি। সেই থেকে এ বালকের চিন্তা আর ধ্যান ছিল পড়ালেখা আবার শুরু করার, যে কোনোভাবেই তার স্কুলে ফিরতে হবে। রায়হান তার সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে শুরু করেন সাধনা। দুই হাত নেই সে বাধা ভুলে, মনোবলে লেখালেখির চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি। হঠাৎ একদিন তার লেখার সেই চেষ্টা বাস্তবে পরিণত হয়। রায়হানের এমন সীমাহীন আগ্রহের কারণে গ্রামের আল রায়েদ একাডেমি নামের এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রিন্সিপাল তাকে ভর্তি করান।

পড়ালেখার দীর্ঘ দু’বছর বিরতির পর পরিবারের সদস্যদের পরামর্শে তৃতীয় শ্রেণি থেকে পড়া শুরু করেন। আর এ অদম্য যাত্রায় যেন আর থামাতে পারেনি তার আকাশছোঁয়ার স্বপ্নকে। এরপর ২০০৪ সালে ভর্তি হন চকরিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে জেএসসি পরীক্ষা দেন কারও সহায়তা ছাড়া। ২০১৪ সালে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে এসএসসি পাস করে স্কুলের গণ্ডি সমাপ্ত করেন। ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হন। কোনো শ্রুতিলেখক ছাড়া অন্য প্রতিবন্ধীদের মতো বাড়তি সময়ও গ্রহণ করেননি বলে জানান রায়হান।

দেশের প্রথম অ্যাপভিত্তিক অনলাইন রেস্টুরেন্টের সিইও!

বাহার উদ্দীন রায়হান বাসায় সেদিন একা। বাসায় রান্না করার মতো কেউ না থাকায় খুব বিপাকে পড়লেন কী করা যায়। হঠাৎ মাথায় এসে গেল অসাধারণ এক ধারণা! আচ্ছা, স্মার্টফোনের অ্যাপ দিয়ে যদি কোনো অনলাইন রেস্টুরেন্ট করা যায় তাহলে কেমন হয় ব্যাপারটা!

বন্ধুদের বিষয়টি জানালে তারাও রায়হানের পাশে থাকবেন বলে প্রেরণা দেন। এভাবেই কেটে যায় প্রায় ৬ মাস। তার বন্ধুরা কাজটিতে প্রথম দিকে পাশে থাকবেন বলে কথা দিলেও পরে কেউ কথা রাখেননি। তবুও তার ইচ্ছাশক্তিতে দমেননি রায়হান। এবার তিনি ঠিক করলেন, একাই করবেন সেই অ্যাপভিত্তিক অনলাইন রেস্টুরেন্ট।

বাহার উদ্দীন রায়হানের পরিবারের অবস্থা: অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে দিন কাটছিল। তার বাবা না থাকায় মা খালেদা বেগম একাই পরিবারের আর্থিক যোগানদাতা ছিলেন। রায়হানের মায়ের একার পক্ষে ছোট এ পরিবার চালাতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম। এর মাঝেও রায়হান নিজ আয় দিয়ে শিক্ষা জীবনের খরচ চালাতেন। সঙ্গে কিছু অর্থ সঞ্চয় করা শুরু করলেন। এভাবেই ১৪ জুলাই ২০১৯ সালে ২১ বছর বয়সী এ তরুণ সূচনা করেন দেশের সর্বপ্রথম অ্যাপভিত্তিক অনলাইন রেস্টুরেন্ট সেবা ‘খাবার লাগবে’র।

সাফল্যের গল্প বলতে গিয়ে রায়হান বলেন, সম্পূর্ণ অ্যাপভিত্তিক অনলাইন রেস্টুরেন্ট করার কারণটি হলো দেশের অনেক হোম ডেলিভারি ফুড প্রোভাইডার আছে। তবে আমরা সব সময় চায়নিজ রেস্টুরেন্টের খাবারের স্বাদ গ্রহণ করতে করতে বিরক্ত। যার কারণে ‘খাবার লাগবে’ নিজেদের রান্নাঘরের তৈরি দেশীয় খাবার চট্টগ্রামজুড়ে সার্ভিস দিচ্ছে। মাত্র ৬ মাসে ‘খাবার লাগবে’ যেভাবে চট্টগ্রামে সাড়া ফেলেছে, তা আমাকে প্রেরণা জোগায়।

ইনশাল্লাহ আগামীতে বাংলাদেশজুড়ে ‘খাবার লাগবে’ সেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বর্তমানে যদি আমাদের এ যাত্রায় কারও পৃষ্ঠপোষকতা পাই তাহলে ‘খাবার লাগবে’ দেশেজুড়ে সার্ভিস দেওয়াটা আমার জন্য সুবিধা হবে। অ্যাপভিত্তিক দেশের প্রথম অনলাইন রেস্টুরেন্ট ‘খাবার লাগবে’র কার্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিচ্ছেন বলে জানান বাহার।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Tweet about this on Twitter
Twitter
Pin on Pinterest
Pinterest

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *