রাজশাহীতে শিক্ষার্থীদের ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে রেসটুরেন্টে সেলফিবাজি, উদাসীন বাবা-মা

স্টাফ রিপোর্টার

রাজশাহীতে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে শিক্ষার্থীদের ক্লাশ ফাঁকি। ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় বিস্তৃর্ণ পদ্মার পাড়, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, পার্ক ছাড়াও বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে দেখা মেলছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের।

শিক্ষকদের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে চরম বিপাকে রয়েছি আমরা। মহানগরীর সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একই অবস্থা। বহু অভিভাবক সমাবেশ, বিবিধ আইন-কানুন প্রয়োগ ও বিধি-নিষেধ সত্তে¡ও শিক্ষার্থীদের ক্লাশমূখী করানো যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে, অভিভাবকদের উদাসীনতা ও অবহেলাকেই দায় করছেন শিক্ষকমন্ডলীরা।

অন্যদিকে, অভিভাবকেরা দোষাচ্ছেন শিক্ষকদের। তারা বলছেন, প্রতিষ্ঠানে তাদের সন্তানরা পৌঁছালো কি-না তা অভিভাবকদের অবহিত করা হয় না। উল্টো অভিভাবকদের বিভিন্ন কথা শোনান শিক্ষকরা।

অগ্নিবাণী প্রতিনিধিকে নগরীর শিরোইল সরকারী স্কুলে পড়া অন্তিক নামের ৮ম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীর বাবা প্রফেসর বোরহান উদ্দীন বলেন, আমাদের সন্তানরা সকাল হলেই তাদের প্রতিষ্ঠানে চলে যায় ক্লাশ করতে। তাছাড়া আমরাও যার যার কাজে ব্যস্ত থাকি। সন্তান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঢুকলো কিনা তা আমরা জানতে পারি না।

তিনি বলেন, যুগ উন্নত হয়েছে। এখন অনেক স্কুলেই ফিঙ্গার প্রিন্টের মাধ্যমে গার্ডিয়ানদের কাছে মেসেজ পাঠানো হয়। ডিজিটাল যুগে ফিংগারিং করে মেসেজ আসলেও তোহ আমরা জানতে পারি, সেটাও তোহ আসে না! আমরা বুঝবো কিভাবে?

অন্যদিকে, নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক নগরীর অগ্রণী স্কুলের ১০ শ্রেণীর ছাত্রের বাবা জানান, ‘কিছুদিন আগে আমার ছেলের বিষয়ে এক অভিযোগ নিয়ে আমাকে স্কুলে ডাকা হলো। সেখানে প্রথম অভিযোগ আমার ছেলে স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। আসলেও অন্যান্য বন্ধুদের ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে বাইরে আড্ডায় উৎসাহিত করে। আমার ছেলে স্কুলে যাচ্ছে কি-না, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠান থেকে কি আমাকে অবহিত করবে না? আমি বুঝব কিভাবে সে স্কুলে আসে না, আড্ডা দেয়’?

আক্ষেপের স্বরে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানে একগাদা বেতন নেওয়া হচ্ছে। অথচ, ছাত্র স্কুলে ঠিকভাবে যাচ্ছে না, সে বিষয়টি জানানোর জন্য বাবা-মাকে ফোনে দু’এক টাকা খরচ করে জানাতে তাদের গায়ে বাধছে। আবার কোনো আকাম ঘটালে তখন আমাদের ঠিকই ফোন করে ডাকা হয়। এক সপ্তাহ ১টা ছাত্র স্কুলে না আসলেই হাজিরা খাতা দেখে তার বাবা-মাকে ফোনে জানালেই অভিভাবক সচেতন হতে পারে। সেবিষয়টিও আমাদের জানানো হয় না।’

এদিকে, শিক্ষানগরী রাজশাহীর অধিকাংশ শিক্ষার্থীদের আড্ডা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে পদ্মার পাড়। এই আড্ডার জায়গাকে লক্ষ্য করে সেখানে গড়েছে বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট। গত মাস দেড়েক শিক্ষার্থীদের সেই আড্ডাখানা গুলোতে হানা দেন রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. হাবিবুর রহমান। সেখানে তিনি ফাঁকিবাজ শিক্ষার্থীদের ধরে ধরে ক্লাশ ফাঁকি এড়ানোর বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। ভালো রেজাল্ট করতে হলে ক্লাশে উপস্থিত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই সে সম্পর্কে তিনি জ্ঞান দান করেন।

ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিসি অভিযানে নগরীর ভদ্রা পার্কে ক্লাস ফাঁকি ও অসামাজিক কাজে লিপ্ত যুগল আটক
ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিসি অভিযানে নগরীর ভদ্রা পার্কে ক্লাস ফাঁকি ও অসামাজিক কাজে লিপ্ত যুগল আটক

আবার, ক’দিন আগেই রাজশাহী জেলা প্রশাসকের উদ্দোগ্যে ম্যাজিট্রেট ও পুলিশ প্রশাসন দ্বারা বিভিন্ন পার্ক, নদীর পাড় ও বিনোদন কেন্দ্রে গিয়ে ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে আড্ডারত ছাত্রদের ধরে হুসিয়ারি দেওয়া হয়। প্রত্যেক ছাত্রদের বাবা মার কাছে ফোন করে তাদের সন্তান সম্পর্কে জানানো হয়। এছাড়াও গত মাসের ৩১ আগস্টে রাজশাহী জেলা প্রশাসক, জেলা শিক্ষা অফিসার ও শিক্ষা ডিজির সম্বনয়ে ডিজিটাল ক্যাম্পাস ও ক্লাসফাঁকি রোধে নগরীর সকল স্কুলের প্রধানদের নিয়ে ১টি সভার আয়োজন করেন। তবুও শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্লাশ ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা তেমন কমেনি।

প্রসাশন ও শিক্ষক এবং অভিভাবকদের নজরে পড়ায় এখন শিক্ষার্থীদের আড্ডার ধরনও চেঞ্জ হয়েছে। রোমান্স, গল্প বা আড্ডার জায়গাও পরিবর্তিত হয়েছে।

অগ্নিবাণীর অনুসন্ধানে জানা যায়, ইদানীং পদ্মাপাড়, পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্রে তেমন দেখা মিলছে না শিক্ষার্থীদের। এখন শিক্ষার্থীদের বেশিভাগ সময় কাটছে রেস্টুরেন্টগুলোতে। শিক্ষার্থীদের ধারনা, এখন রেস্টুরেন্টগুলোই আড্ডা দেওয়ার নিরাপদ স্থান।

তাই তাদের ক্লাস ফাঁকির অধিকাংশ সময় কাটছে রেস্টুরেন্ট নামের এসি রুমে লাল, নীল, সবুজ আলো-ছায়ার থাই গøাসে মোড়ানো ঘরগুলোতে। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে দিব্বি গল্প, আড্ডা আর রোমান্সে ফাস্টফুডের টেবিলে সময় কাটছে বেশিভাগ শিক্ষার্থীর।

রাজশাহীর নিউ মার্কেট, সাহেব বাজার, পদ্মার পাড়, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়, লক্ষীপুরসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে ছোট বড় প্রায় শত শত রেস্টুরেন্ট আর ফাস্টফুডের দোকান। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের পচ্ছন্দের আড্ডার জায়গা হচ্ছে থিম ওমর প্লাজার রেস্টুরেন্টগুলো। নিউ মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত ওমর থিম প্লাজাতেই রয়েছে ৮টি রেস্টুরেন্ট।

শনিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) থিম ওমর প্লাজায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক অন্যরকমের দৃশ্য, আড্ডায় মোশগুল রাজশাহীর বেশ কিছু স্বনামধন্য স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের। ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে শিক্ষার্থীরা এখনে নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইউনিফর্ম পড়েই আসে। তাতে বোঝা যায় তারা কে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র।

সাদ নামের এক শিক্ষার্থী জানায়, আমাদের বিনোদনের প্রয়োজন রয়েছে। আড্ডায় প্রয়োজন নিরিবিলি পরিবেশ। তাই আমরা নিরিবিলি পরিবেশে বন্ধুদের নিয়ে এখানে আড্ডা দিতে এসেছি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে আড্ডায় ফাস্টফুডের খাবার খাওয়ার মজাই আলাদা। তাছাড়া, এখানে কিছু কিছু রেস্টুরেন্টে শিক্ষার্থী আইডি কার্ড দেখালে ডিসকাউন্ট দেওয়া হয়। তাই শিক্ষার্থীদের বেশি চাপ এসব রেস্টুরেন্টগুলোতেই।

শিক্ষার্থীরা আরো জানায়, এখন পদ্মাপাড়, পদ্মা গার্ডেন, পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্রে মাঝে মাঝেই মেজিস্ট্রেট ও পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। কেউ ধরা পড়লে সাথে সাথে  পরিবারের লোকজনকে ফোনে বিষয়টি জানানো হচ্ছে। অনেক সময় মুচলেখাও নেওয়া হচ্ছে। তাই, এসব বিপদ এড়ানোর জন্য রেস্টুরেন্ট ও ফাস্টফুডের দোকান গুলোতে আড্ডা নিরাপদ। এখানে পুলিশ বা ম্যাজিট্রেটের কোনো ভয় নেই। আবার দেখারও কেউ নেই।

ক্লাসফাঁকি রোধের উপায় সম্পর্কে সময়ের আলো প্রতিনিধিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডীন প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের বিনোদন ব্যবস্থার অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে। ক্লাসে ধরে রাখতে হলে তাদের ক্যাম্পাসে ইনডোর গেমসের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিষ্ঠান গুলোর মধ্যে সুন্দর ও মনোরম মানসম্মত ক্যান্টিন তৈরী করতে হবে। এতে করে শিক্ষার্থীরা আর বাইরে আড্ডা না দিয়ে নিজ প্রতিষ্ঠানে সময় কাটাতে বেশী আগ্রহী হবে। ইউরোপের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালেই তা সহজে পরিলক্ষিত হয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা ক্লাশ ফাঁকি দেয় না, বরং প্রতিদিন নিজ প্রতিষ্ঠানে স্বানন্দে গিয়ে হাজির হয়।’

তিনি বলেন, ‘শুধু পাশের হার বৃদ্ধি, এবং শিক্ষার্থীদের এ প্লাস গোল্ডেন এ প্লাস মার্ক  দিলেই হবে না। শিক্ষার্থীদের সঠিক পাঠদান সুশিক্ষিত করতে হবে। পড়াশোনার পাশা-পাশি বিনোদন ও আড্ডার প্রয়োজন রয়েছে, তবে পদ্মার পাড়, পার্ক বা হোটেল, রেস্টুরেন্টে নয়। এখনকার যে রেস্টুরেন্ট হয়েছে তাতে এসির বাতাস গায়ে লাগিয়ে পয়সা নেয়। খাবারের দাম ২-৩ গুণ বেশী। তাছাড়া শিক্ষার্থীরা পয়সা পাবে কোথায়? এসব আড্ডায় বসতে যে টাকার প্রয়োজন পড়ে, তা জোগাড়ার্থে অনেক শিক্ষার্থী অনৈতিক পথ অবলম্বন করতে শুরু করে। তাই শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। নীতিবান মানুষ কখনও বিবেক পরিপন্থী কাজে যেতে পারে না। তাই নৈতিকতার শিক্ষা অতীব জরুরী। ’

তিনি আরো বলেন, ‘ক্লাস ফাঁকি বন্ধে প্রসাশনসহ স্কুল কলেজের প্রধানদের কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। অন্যথায়, শিক্ষার্থীদের দ্বারা অনৈতিক কর্মকান্ডসহ বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের সভাপতি, গভার্নিং বডির মেম্বার, থানা ও জেলা শিক্ষা অফিসারদের পাশা-পাশি স্থানীয় প্রশাসনকে দারুন সহযোগিতা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের হাজিরা শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল হাজিরা পদ্ধতি ও সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা খুবই জরুরী। নৈতিক শিক্ষা যেমন তাদের সঠিক জ্ঞানদান করবে, তেমনি প্রযুক্তি তাদের ফাঁকিবাজি বন্ধে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।’

এই সংবাদটি শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on Whatsapp
Whatsapp
Pin on Pinterest
Pinterest

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *