রাজশাহীর ক্যাসিনো জেলা ক্রীড়া সংস্থার ‘হাউজি’: রমরমা জুয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকাজুড়ে যখন ক্যাসিনো ব্যবসা নিয়ে তোলপাড়, তখনো রাজশাহীতে চলছে হাউজি’র আসর। রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সংস্থার অধিনে বছরের পর বছর ধরে এই অবৈধ জুয়ার আসরটি। রাজশাহী মুক্তিযুদ্ধ স্টেডিয়ামের জিমনেসিয়ামের পাশে দোতলায় বসে এই জুয়া খেলার আসরটি। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবারও জেলা ক্রীড়া সংস্থার পরিচালনায় এই জুয়ার আসরটি চালানো হয়। এতে করে রাজশাহীর এক শ্রেণির মানুষ যেমন নিঃস্ব হচ্ছে, তেমনি মাদকের ব্যবহারও বাড়ছে। আবার এই হাউজির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে মাঝে মধ্যেই স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়ে সংঘর্ষ। এ নিয়ে মাঝে মধ্যে হাউজি বন্ধ হলেও আবারো প্রশাসনের ছত্রছায়ায় চলে অবৈধ জুয়ার এই আসরটি।

অভিযোগ উঠেছে, জেলা ক্রীড়ার মাণনোয়ন্নয়ের জন্য অর্থ সংগ্রহের নাম করে এই খেলার নামে যে অর্থ লেনদেন হচ্ছে, তার সিংহভাগই হয় লুটপাট। এর মধ্যে একটি অংশ লুটপাটে রয়েছেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তারাই। আর আরেকটি অংশ যাচ্ছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের পকেটে। প্রতিদিন এভাবে অন্তত দেড়-দুই লাখ টাকা চলে যাচ্ছে লুটপাটের ফাঁদে। আর একটি অংশ গিয়ে জমা পড়ছে জেলা ক্রীড়া সংস্থার ঘরে। এ নিয়ে চরম ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয়দের মাঝে।
সূত্র আরও নিশ্চিত করেছে, প্রতিদিন যে পরিমাণ সাইড খেলা হয়, তার পুরো অংশ যাই ওই নেতাদের পকেটে। আর নেতারা তাদের রাজত্ব বহাল রাখতে সেই টাকার কিছু অংশ তুলে দেয়া হয় স্থানীয় মাস্তান, নেশাখোর ও বখাটেদের হাতে। ফলে রাজশাহী মুক্তিযুদ্ধ স্টেডিয়ামের আশে-পাশের এলাকা পরিণত হয়েছে নানা অপকর্মের অভয়ারণ্য হিসেবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী মুক্তিযুদ্ধ স্টেডিয়ামের দোতলায় হাউজি প্যান্ডেল বসিয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত চলে এ জুয়া খেলা। এতে অংশ নেয় অন্তত দেড় থেকে দুই হাজার জুয়াড়ি। প্রতিদিন এসব জুয়াড়ির অন্তত ৯০ ভাগই হাউজি খেলতে গিয়ে টাকা খুইয়ে বাড়ি ফেরেন। আর ১০ ভাগ কিছু লাভের মুখ দেখে বাড়ি ফেরেন। এই লাভের আশায় এখানে প্রতিদিন শত শত মানুষ জুয়ার আসরে যোগ দেন। জেলা ক্রীড়া সংস্থার এ খাত থেকে প্রতিদিন অন্তত ২-৩ লাখ টাকা আয় হয়। কিন্তু তার মধ্যে অন্তত দেড়-দুই লাখ লাখ টাকায় হয়ে থাকে লুটপাট। বিশেষ করে সাইড খেলার নামে প্রতিদিন যে টাকা আয় হয়, তার একটি টাকাও জমা হয় না জেলা ক্রীড়া সংস্থার কোষাগারে। সব টাকায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের দখলে চলে যায়। তারাই হাউজির সাইড খেলা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে সাঙ্গ-পাঙ্গদের দিয়ে। আর খেলা শেষে সেই টাকা হচ্ছে কয়েক ভাগ। যার সিংহভাগই পাচ্ছেন নেতাকর্মীরা। তবে চলতি মাসের শুরুর দিকে জেলা ক্রীড়া সংস্থার পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের মধ্যে টাকার ভাগ নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে এখন সাইড খেলার অন্তত ৬০ ভাগ টাকা গত কয়েকদিন ধরে সংস্থার হিসেব নম্বরে জমা হচ্ছে।

সূত্র আরও জানায়, স্থানীয় ১৫ ও ১৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের নেতারা নিয়ন্ত্রণ করে এই সাইড খেলা। যাদের নেপথ্যে থেকে ইন্ধন দেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাও। এরই সাইড খেলার নামে প্রতিদিন আদায়কৃত টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিচ্ছেন। যার কিছু অংশ অবশ্য জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তাদের পকেটেও যাচ্ছে।
এর আগে সাইড খেলা নিয়ে কয়েক দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৫ সালের ২০ জুন সাইড খেলা নিয়ে স্থানীয় যুবলীগের দু’গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পরে প্রায় ৬ মাস বন্ধ ছিল হাউজি খেলা। পুলিশ হাউজি প্যান্ডেলে তালা ঝুলিয়ে দিলেও পরপবর্তি আবারো প্রশাসনকে ম্যানেজ করে চালু হয় হাউজি খেলা।

রাজশাহী জেলা স্টেডিয়ামের একাধিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘হাউজির সাইড খেলার মাধ্যমে বছরে অন্তত দেড় দুই কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে। এসব টাকার কোনো হিসাব-নিকাশ থাকছে না। বছর পাঁচেক আগে যেখানে হাউজি থেকে বছরে আয় হতো দেড় থেকে দুই কোটি টাকা, এখন সেখানে আয় দেখানো হয় বড় জোর ৫০ লাখ টাকা। এতেই প্রমাণ হয়, হাউজির অধিকাংশ টাকায় এখন লুটপাট হচ্ছে কর্মকর্তাদের মাঝে। আর সাইড খেলা লুটপাট করছেন স্থানীয় নেতারা। ফলে এসব নিয়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যদের মাঝেও রয়েছে চরম ক্ষোভ।

তবে জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক রাফিউস সামস্ প্যাডি বলেন, ‘হাউজির টাকা লুটপাটের কোনো সুযোগ নাই। হাউজি পরিচালনা কমিটি প্রতিদিন হিসেব রাখেন। আর সাইড খেলার টাকা যাচ্ছে বিভিন্ন খাতে। তবে সেটি ২৫-৩০ হাজার হবে হয়তো। এর বেশি হওয়ার কথা নয়। তবে জেলা ক্রীড়া সংস্থা যেসব খেলা পরিচালনা করে, সেসব খেলা ধরে রাখার জন্য আয়ের বিকল্প হিসেবে এই হাউজি খেলার আসর বসানো হয়। এটিই জেলা ক্রীড়া সংস্থার আয়ের অন্যতম উৎস।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Tweet about this on Twitter
Twitter
Pin on Pinterest
Pinterest

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *